Archives

শিক্ষা

বিদ্যালয় বন্ধ, কোচিংয়ের ক্লাস হচ্ছে শিক্ষকদের বাড়িতে

বিদ্যালয় বন্ধ

নিউজ ডেস্ক: মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে এক বছর ধরে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার মূল উদ্দেশ্য প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ। কিন্তু এই মহামারির মধ্যেও বেশকিছু অসাধু শিক্ষক কোচিং বাণিজ্য শুরু করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংক্রমণ ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কোচিংয়ের ক্লাস নিচ্ছেন রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশকিছু শিক্ষক। স্কুল-কলেজ খোলা না থাকলেও বর্তমানে ওই শিক্ষকদের বাড়িতে ক্লাস হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো রাজধানীর নামকরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের একাংশ নিজেদের বাসায় কোচিং করাচ্ছেন।

রাজধানীর বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে খন্দকার গলিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোচিং চলে। শিক্ষকরা ফ্ল্যাট বাড়ির একটি বা একাধিক কক্ষ ভাড়া করে কোচিং সেন্টার গড়ে তুলেছেন। সেখানে ব্যাচে ভাগ করে চলছে ক্লাস।

কেউ কেউ আবার ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে বাধ্য করে কোচিংয়ে আনছেন নিজ ক্লাসের শিক্ষার্থীদের। বিনিময়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসে নেয়া হচ্ছে ১ থেকে ২ হাজার টাকা। এমন অসংখ্য অভিযোগ পাওয়ার পর অনুসন্ধানে এর সত্যতা মেলে।

অভিভাবকদের দাবি, বাধ্য হয়ে সন্তানদের বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের কাছে পাঠাতে হচ্ছে। কারণ, স্কুলের জুম ক্লাস করে শিক্ষার্থীদের কোনো ‘লাভ’ হয় না।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারি মনিটরিং না থাকায় কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না। সেজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি মনিটরিং টিম গঠন করে কোচিং নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক সংগঠনের নেতারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজসহ নামিদামি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে কোচিং বাণিজ্য শুরু করেন। এক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করছেন জুম অ্যাপ ও ফেসবুক লাইভসহ নানা মাধ্যম। নানা কৌশলে শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষার্থীরা জানান, রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিনটি শাখায় প্রায় ৬০০ শিক্ষক কর্মরত। তাদের অন্তত ২৫ শতাংশ কোচিং বাণিজ্যে জড়িত। এর মধ্যে রয়েছেন মতিঝিল শাখার ইংরেজি বিষয়ের এক শিক্ষক, বাংলার এক শিক্ষক, সমাজ বিজ্ঞানের এক শিক্ষক, ইংরেজির দুই শিক্ষক, বাংলার এক শিক্ষক ও জীববিজ্ঞানের এক শিক্ষক। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির তিনটি শাখারই শতাধিক শিক্ষক প্রতিদিন সশরীরে ও ভার্চুয়ালি কোচিং করাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের স্কুল বন্ধ হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শ্রেণি শিক্ষকরা লাইভ ক্লাস শুরু করেন। এতে প্রায় ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত হচ্ছে। শিক্ষকরা যাতে কোচিং বাণিজ্য না করে সে জন্য ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে সই নেয়া হয়েছে। এরপরও কেউ কেউ কোচিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন বলে আমাদের কাছে অভিযোগ আসছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হলে আগে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। স্কুলে যৌক্তিক কারণে এক থেকে দুশ টাকা বাড়ালে তারা নানাভাবে প্রতিবাদ জানান, আর স্কুল বন্ধ থাকার পরও যখন সন্তানদের শিক্ষকদের বাসায় পাঠিয়ে মাসে কয়েক হাজার টাকা দিচ্ছেন, তখন তাদের গায়ে লাগছে না? যারা কোচিং বাণিজ্য করছে তাদের নাম দেন আমরা গভর্নিং বডিতে তুলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার ইংরেজি বিষয়ের এক শিক্ষক, রসায়নের এক শিক্ষক, সাবেক এক শিক্ষক প্রতিনিধি, এক নারী শিক্ষক ছাড়াও বেশ কয়েকজন শিক্ষক ডিজিটাল পদ্ধতিতে কোচিং করাচ্ছেন।

এসব শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দাবি করেন, ফেসবুক ও জুম অ্যাপে ৩০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কোচিং শুরু করলেও অধ্যক্ষের নির্দেশে অনেকেই তা বন্ধ করে দিয়েছেন। নতুন করে আবার কার্যক্রম শুরুর জন্য কোচিং সেন্টার পরিচ্ছন্নের কাজ শুরু করেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ অধ্যাপক কামরুন নাহার জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোচিং বাণিজ্য বিষয়ে আমার কাছে কেউ অভিযোগ দেয়নি। নিয়মের মধ্যে থেকে কেউ কোচিং করালে তা অন্যায় হবে না। কেউ কোচিং করলে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল হক দুলু জাগো নিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে কোচিং বাণিজ্য করছেন আইডিয়ালের বেশ কয়েকজন শিক্ষক। এসব সম্মানহীন শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন দফতরে মামলা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোচিং নীতিমালা বাস্তবায়নে আদালতের নির্দেশনা থাকলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং কমিটি না থাকায় তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।’ দ্রুত একটি কমিটি গঠন করে কোচিং নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানান জিয়াউল হক দুলু।

এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. সৈয়দ গোলাম ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মধ্যে অনেক শিক্ষক অনলাইনে কোচিং করাচ্ছেন বলে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। কেউ যদি বাধ্য করে কোচিং করিয়ে টাকা আদায় করে তা মেনে নেয়া হবে না। কারও বিরুদ্ধে এমন তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এ সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চলমান রাখতে সংসদ টেলিভিশনে শ্রেণি-ক্লাস সম্প্রচার শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। এরপর প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য টেলিভিশন ক্লাস সম্প্রচার হয়।

এদিকে আগামী ২৩ মে থেকে দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে ক্লাস শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।সূত্র: জাগোনিউজ২৪.কম

এসএসআর/জামালপুর লাইভ

বার্তা সম্পাদক
%d bloggers like this: